স্ত্রী আর দুই সন্তান নিয়ে ময়নুলের ছিল সুখের সংসার। ফল ব্যাবসা করে ছেলে মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারের সমস্ত চাহিদা পূরণ করতেন তিনি নিজেই। স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে একদিন তার মেয়ে চিকিৎসক আর ছেলে হবে বড় আলেম। পরিবারে থাকবেনা কোন অভাব। নিজে না পারলেও ভবিষ্যতে দুই সন্তান প্রতিষ্ঠিত হয়ে নিজেদের জন্য জায়গা কিনবে এবং সেই জায়গায় ঘর নির্মাণ করে পরিবারের সবাইমিলে একসাথে থাকবেন। কিন্তু ময়নুলের সেই স্বপ্ন, স্বপ্নই থেকে গেল। একটি বুলেট তার স্বপ্ন ভাঙার পাশাপাশি স্ত্রী সন্তানদের করে দিল অসহায়। ৫ আগস্ট বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলনে বিয়ানীবাজার উপজেলার পিএইচ জি উচ্চ বিদ্যালয়ের কাছে গুলিবিদ্ধ হন মইনুল ইসলাম। আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার শারিরিক অবস্থার অবনতি হলে পরবর্তীতে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পর দিন ৬ আগষ্ট বিয়ানীবাজরার সরকারি পৌর গোরস্থানে বাবার কবরের পাশে মইনুল ইসলামের দাফন সম্পন্ন করা হয়।
মইনুলের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার মোল্লাপাড়া হলেও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বিয়ানীবাজার পৌর শহরের নয়াগ্রামে পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। সংসারের সমস্ত প্রয়োজন মেটাতে বিয়ানীবাজার শহরে ফলের ব্যবসা শুরু করেন। সামান্য পুঁজি দিয়ে শুরু করা ব্যবসা দিয়ে কোন রকমে কাটছিল তার সুখের সংসার। দুই সন্তানের মধ্যে ফাতিমা ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে এবং শিহাব ৫ম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত আছে। স্ত্রী শিরিন বেগমকে নিয়ে সন্তান দুটিকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার অবিরাম চেষ্টা ছিল মইনুলের।
শহীদ মইনুল ইসলামের মেয়ে ফাতিমা ও ছেলে শিহাব জানায়, কৃষি কাজের পাশাপাশি বৃক্ষ রোপন ছিল তার বাবার খুব পছন্দের কাজ। যেখানে খালি জায়গা পেতেন সেখানেই বৃক্ষ রোপন করতেন তিনি। পৌরসভার বাজারে ফল ও পান সুপারির দোকানের আয় দিয়েই চলতো তাদের সংসার। এমনিতেই তেমন কোন শখ ছিলনা মইনুল ইসলামের তবে স্বপ্ন দেখতেন তার মেয়ে ফাতিমা একদিন বড় চিকিৎসক হয়ে গ্রামের মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিবে। আর ছেলে শিহাব মাদ্রাসায় পড়ে বড় আলেম হয়ে দ্বীনের খেদমত করে যাবে। বাবার স্বপ্নের কথা গুলো বলতে বলতে নিজের অজান্তেই চোখে জল এসে যায় ফাতিমার। প্রতিদিন বাবার কাছে কলা ও বিস্কুটের আবদার থাকতো তার। আর ছোট ভাই শিহাব তো সব সময় নতুন পোষাকের জন্য বায়না ধরতো বাবার কাছে। এখন বাবা নেই কে তাদের আদর করবে। কার কাছে তারা আবদার করবে। কে তাদের কে সাহায্য করবে। এই কথাগুলো বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে ভাই-বোন। শিহাব ও ফাতিমার একটাই লক্ষ্য বাবার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা। তাই সরকারের পাশাপাশি অন্যান্য সবাই কে তাদের পরিবাবের পাশে দাঁড়াবার অনুরোধ জানান ফাতিমা। এদিকে শিহাব বলে, ওইদিন আব্বু আমারে বলেছিল, চল বাপ বেটা একসাথে আন্দোলনে যাই। দেশের জন্য একসাথে শহিদ হই। আমিও আব্বুর সাথে সাথে গিয়েছিলাম কিন্তু অর্ধেক পথ থেকে ফিরে আসি। কিন্তু আমার আব্বু আর ফিরে আসেননি।
এদিকে স্বামীকে হারিয়ে ছেলে-মেয়ে নিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে শোকাহত স্ত্রী শিরিন বেগমের ।
স্বামীর মৃত্যর তিন মাস পার হয়ে গেলেও সরকারি কোন সহযোগিতা পাননি তিনি। তাই ছেলে মেয়ের পড়ালেখা সহ সংসার চালানো নিয়েও পড়েছেন সংশয়ে। একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামীকে হারিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তিনি। বাসা ভাড়া, সন্তানদের পড়ালেখার খরচ, পবিরাবের চাহিদা পূরণে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়ছেন।
স্থাণীয় কিছু হৃদয়বানদের সহযোগিতায় তিনমাস কোন রকমে পার করলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে রয়েছেন চিন্তায়। তিনি বলেন, সবাই তো আর প্রতিদিন আমাদের কে সাহায্য করবে না। সরকারও এখন পর্যন্ত কোন সাহায্য করলো না। খবরও নিলনা আমরা কেমন আছি। আর কবে খবর নিবে তা জানিনা।
শিরিন বেগম বলেন, নিজস্ব জমি না থাকায় ভাড়া বাসায় থাকতে হয় আমাদের। সরকার যদি আমাদের জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেয় তাহলে আমার এতিম ছেলে মেয়েদের একটু মাথাগোজার ঠাঁই হত। সন্তানদের পড়ালেখা চালিয়ে কোনভাবে দিন পার করলেই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। আমিও আর কয়দিন বাঁচবো। সন্তানদের যদি ভালো কোন ব্যবস্থা হয়েছে দেখে যেতে পারি তবেই শান্তিতে মরতে পারবো। নিজের কোন চাওয়া না থাকলেও স্বামী হত্যায় প্রকৃত দোষীদের বিচার চান তিনি।