জকিগঞ্জ উপজেলায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষে বয়ে যাওয়া সুরমা-কুশিয়ারা নদীর ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। নদীতীরে মানুষের চোখের সামনে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি ও বসতভিটা। ভাঙনকবলিত এলাকা থেকে কিছু দিনের মধ্যে ঘরবাড়ি সরাতে না পারলে সব কিছুই সুরমা ও কুশিয়ারায় বিলীন হবে বলে আশঙ্কা করছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। গেল বর্ষা মৌসুমে চার দফা বন্যার পর এবার শুষ্ক মৌসুমে ভয়াবহ নদীভাঙনে অসহায় হয়ে পড়েছেন দুই সীমান্ত উপজেলার মানুষ। নদীভাঙনে একদিকে দেশের মানচিত্র ছোট হচ্ছে, অন্যদিকে লোকজন হারাচ্ছেন জমি।
তিন দিক আন্তঃসীমান্ত নদীবেষ্টিত এ দুই উপজেলার বেশিরভাগ এলাকায় নদীভাঙনের চিত্র ভয়াবহ। ইতোমধ্যে বিভিন্ন গ্রাম, জনপদ, কৃষিজমি, ঘরবাড়ি, হাটবাজার, সড়ক, বহু অবকাঠামো, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর গোরস্তান নদীতে বিলীন হয়েছে। কয়েক বছরের ভাঙনে সুরমা-কুশিয়ারা নদী এখন বাংলাদেশ সীমান্তের অন্তত এক-দুই কিলোমিটার ভেতর দিয়ে বয়ে চলছে। বাংলাদেশের বহু জমি ভারতের সীমানায় চলে গেছে। চোখের সামনেই সেই জমিতে ভারতীয়রা চাষাবাদ করছেন। হাজারো পরিবার বসতভিটা হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ নিয়ে ক্ষোভের শেষ নেই সাধারণ মানুষের মনে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুরো উপজেলার অর্ধশতাধিক স্থানে রয়েছে ভাঙনের ভয়াল চিত্র।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, এবার শুষ্ক মৌসুমে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে কুশিয়ারা নদীর জকিগঞ্জ পৌরসভার কেছরী, মাইজকান্দি, জকিগঞ্জ বাজার, ছয়লেন, নরসিংহপুর ও হাইদ্রাবন্দ গ্রাম; খলাছড়া ইউনিয়নের ভূঁইয়ারমুড়া পশ্চিম লোহার মহল, কাপনা, গাগলাজুর, সুনাপুর, বেউর; জকিগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ছবড়িয়া, মানিকপুর, ভাখরশাল, শষ্যকুঁড়ি, সেনাপতিরচক, লালোগ্রাম, রারাই; সুলতানপুর ইউনিয়নের খাদিমান, অজরগ্রাম, সুলতানপুর, ইছাপুর, খাদিমান, গঙ্গাজল, ভক্তিপুর, সহিদাবাদ, রহিমপুর; বিরশ্রী ইউনিয়নের সোনাপুর, পিয়াইপুর, পীরনগর, লক্ষ্মীবাজার, বড়চালিয়া, উজিরপুর, কোনাগ্রাম, মাজরগ্রাম, লাফাকোনা, বড়পাথর, জামডহর, সুপ্রাকান্দী; বারঠাকুরী ইউনিয়নের পিল্লাকান্দী, সুরমা নদীর উত্তরকুল, লাড়িগ্রাম, আমলশীদ, বারঠাকুরী, বিন্নাপাড়া, ছালেহপুর; কসকনকপুর ইউনিয়নের বলরামেরচক, হাজিগঞ্জ, মুন্সিপাড়া, মিয়াগুল, চেকপোস্ট, মৌলভীরচক, বলরামেরচক, মিয়াগুল, বিয়াবাইল, ইনামতি, বিয়াবাইল; মানিকপুর ইউনিয়নের হরাইত্রিলোচন আকাশমল্লিক, বাল্লা, রঘুরচক; কাজলসার ইউনিয়নের নালুহাটি, বড়বন্দ, আটগ্রাম; বারহাল ইউনিয়নের চক, নিজগ্রাম, পুটিজুরি, শরীফাবাদ, শাহবাগ, বারইগ্রাম, চককোনাগ্রাম ও নোয়াগ্রামে ভয়াবহ ভাঙন চলছে। এ ছাড়া কিছু এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সংস্কার করা হয়নি। সেসব এলাকায় বর্ষা মৌসুমে বাঁধ উপচে নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারত থেকে বরাক নদী আমলশীদে এসে সুরমা-কুশিয়ারায় রূপ নিয়েছে। প্রতি বর্ষা মৌসুমে ভারতের উজানের ঢল বরাক নদী হয়ে এ দুটি নদীতে আসে। এরপর প্রায় ৭০ শতাংশ পানি কুশিয়ারা ও ৩০ শতাংশ পানি সুরমা দিয়ে সিলেট বিভাগের প্রায় ১০০টি নদনদীতে গিয়ে পড়ে। বরাক হয়ে ভারতের পাহাড়ি ঢল নামার সঙ্গে সঙ্গেই জকিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন দেখা দেয়। চলতি বছরে বরাক নদী দিয়ে আসা ভারতের ঢলে জকিগঞ্জে পরপর চারবার বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় পুরো উপজেলা। বন্যার ক্ষত এখনও সারানো যায়নি। এর মধ্যে নদীর পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে ভাঙন। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, জকিগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর ডান তীরে ৪১ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ ভাঙন চলছে। এর মধ্যে ভক্তিপুরে ৫০০ মিটার, মানিকপুর বাখরশালে ৮০০ মিটার, শষ্যকুঁড়িতে ৭০০ মিটার, শেখপাড়ায় ২৫০ মিটার, উজিরপুরে ৪০০ মিটার, লক্ষ্মীরারচকে ৫৫০ মিটার, সুনাপুরে ৪০০ মিটার, সুপ্রাকান্দিতে ৪০০ মিটার, গাগলাজুরে ২০০ মিটার, লোহার মহলে ৩৫০ মিটারসহ ১০টি স্থানে প্রায় ৪ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ভেঙেছে। জকিগঞ্জ উপজেলায় ‘সীমান্ত নদীর তীর সংরক্ষণ ও উন্নয়ন (২য় পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় চারটি প্যাকেজে সুপ্রাকান্দি, মানিকপুর, রারাই সেনাপতির চক, বড়চালিয়া ও রহিমপুর নামক স্থানে ১ দশমিক ৮০০ কিলোমিটার নদীর তীর সংরক্ষণ কাজের মধ্যে দুটি প্যাকেজের কাজ শেষ হয়েছে, অপরটি চলমান। এ ছাড়া ‘বন্যা ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন জরুরি সহায়তা’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় জকিগঞ্জ উপজেলায় কুশিয়ার নদীর ডান তীরে ৪১ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পুনর্বাসন কাজ ও অতি ভাঙনপ্রবণ এলাকায় নদীর তীর প্রতিরক্ষা কাজের প্রস্তাবনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে প্রেরণ করা হয়েছে।
সূত্রটি আরও জানায়, সিলেটের সুরমা-কুশিয়ারা নদীর ভাঙন রোধ ও বন্যা ঠেকাতে বেড়িবাঁধ নির্মাণে ইতোমধ্যে ৪৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষায়। ভাঙন রোধের জন্য জরুরি ভিত্তিতে এখন কুশিয়ারা নদীর ছয় কিলোমিটার এলাকায় ব্লক বসাতে হবে। এর জন্য ৩০০ কোটি টাকার প্রয়োজন। চলতি বছরের বন্যার পর নতুন করে কয়েক কিলোমিটার জায়গা সুরমা-কুশিয়ারা নদীতে বিলীন হয়েছে।
জকিগঞ্জ সদর ইউপির সদস্য ছবড়িয়া গ্রামের আব্দুল মুকিত বলেন, আমাদের গ্রামের বহু পরিবারের জায়গা ভারতে চলে গেছে। বসতভিটাহীন মানুষ এখন অন্যের জায়গার ওপর বসবাস করছেন। ছবড়িয়া গ্রামের সৈয়দ আমিরুল ইসলাম মাদানী আল হুসাইনির (রহ) মাজার ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। ভাঙন রোধের উদ্যোগ দ্রুত না নিলে তীরবর্তী অনেক গ্রামের অস্তিত্ব মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে।
জকিগঞ্জ পৌর এলাকার কেছরী গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ছোটবেলায় কুশিয়ারা নদী জকিগঞ্জ বাজার থেকে অনেক দূরে দেখেছেন। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে জকিগঞ্জ বাজারের অনেক জায়গা নদীতে চলে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় জকিগঞ্জ শহর কুশিয়ারা নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, জকিগঞ্জের পরিস্থিতি আসলে খুবই ভয়াবহ। ভাঙন ঠেকানোর জন্য আমরা চেষ্টায় আছি। উচ্চমহলকেও জানানো হয়েছে।