দৃষ্টিহীন হয়ে পড়ার শঙ্কায় দিন কাটছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থী মেহেদী হাসানের। একমাত্র ছেলের চিকিৎসার খরচ যোগাতে নিজের অটোরিকশাটি বিক্রি করে দেন তার বাবা লিটন মিয়া। অটোরিকশা বিক্রির টাকায় কিছুদিন মেহেদীর চিকিৎসা চলে। এরপর ধারদেনা করে ছেলের চিকিৎসার খরচ যোগান লিটন মিয়া। গত তিন মাসে কয়েক দফা অস্ত্রোপচার করেও স্বাভাবিক হয়নি মেহেদীর চোখ। দিনদিন তার দৃষ্টিশক্তি কমে আসছে। অথচ অর্থসংকটের কারণে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারছে না তার অসহায় পরিবার। এখন মেহেদী ও তার বাবা সরকারি সহায়তার দিকে তাকিয়ে আছেন।
কুমিল্লার লালমাই উপজেলার বেলঘর উত্তর ইউনিয়নের পালপাড়া গ্রামের বাসিন্দা লিটন মিয়ার চার সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় মেহেদী হাসান (১৮)। পরিবারের একমাত্র ছেলেসন্তান তিনি। মেহেদী কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী।
মেহেদীর পরিবার জানায়, গত ১৭ জুলাই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নেন মেহেদী। এ সময় পুলিশের গুলিতে আহত হন তিনি। অর্ধশতাধিক ছররা গুলি তার দুই চোখসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে বিদ্ধ হয়।
মেহেদী হাসান বলেন, ‘ঢাকায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে এক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের অধীনে আমি চিকিৎসা নিচ্ছি। কয়েক দিন পরপর সেখানে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। সামনে আমার পরীক্ষা আছে। কিন্তু এখন চোখে সব ঝাপসা দেখছি। চোখের খুব কাছে নিয়েও বইয়ের লেখা পড়া যায় না। ডাক্তার যে চশমার পরামর্শ দিয়েছেন, তা আনতে অর্ডার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসার যে খরচ লাগে, তা বহন করা আমার পরিবারের পক্ষে এখন আর সম্ভব হচ্ছে না। পলিটেকনিক্যালের সমন্বয়কদের পক্ষ থেকে অর্থ সহযোগিতা যা পাওয়া যায়, তা দিয়ে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা করা সম্ভব হয় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুই চোখে এ পর্যন্ত ৬টি অস্ত্রোপচার হয়েছে। ডাক্তার বলেছেন, ‘ডান চোখের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং বাঁ চোখের ৫০ শতাংশ অকেজো হয়ে পড়েছে’। এ মুহূর্তে আমার দরকার উন্নত চিকিৎসার। সরকার বলেছে, ‘সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ফ্রি। কিন্তু আমি যে চিকিৎসকের কাছে গিয়েছি, তিনি আমার ৬টা অপারেশন করেছেন। এখন তাকে বাদ দিয়ে যদি আমি অন্য কোথাও যাই, তাহলে আমার চিকিৎসা ব্যাহত হবে। কারণ আমার এই ডাক্তারই আমাকে শুরু থেকে এ পর্যন্ত দেখে আসছেন।’
লিটন মিয়া বলেন, ‘‘একদিকে ছেলের চিকিৎসার খরচ, অন্যদিকে ছয় সদস্যের পরিবারের প্রতিদিনের খরচ চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। অটোরিকশা বিক্রির পর থেকে কীভাবে চলছি, সেটা কেবল আমিই জানি। এদিক-ওদিক হাত পাততে হচ্ছে। এদিকে ডাক্তার জানিয়েছেন- ‘মেহেদী দৃষ্টি ফিরে পাবে, এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। ডান চোখটি প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। ভালো চিকিৎসা না করালে বাম চোখেরও ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে।’ আমি অসহায় মানুষ। একমাত্র ছেলের চিকিৎসার জন্য এখন রাষ্ট্রের কাছে আবেদন করা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই।’’
মেহেদীর চাচা হায়াতুন্নবী বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই মেধাবী মেহেদী। এসএসসিতে সে জিপিএ-৫ পেয়েছিল। বাড়িতে তাদের দোচালা টিনের ঘর ছাড়া আর তেমন কিছু নেই। নানান টানাপোড়েনের মধ্যেও মেহেদীকে নিয়ে আমার ভাই বড় স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই মেহেদী এখন দৃষ্টি হারাতে বসেছে।’ ছেলেটার ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকার। তার বাবার স্বপ্ন ভেঙে যেতে বসেছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কুমিল্লার অন্যতম সমন্বয়ক সাকিব হোসাইন বলেন, ‘মেহেদী হাসানের খোঁজ নিয়ে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে মেহেদীর চিকিৎসা ও পরিবারকে সহযোগিতা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
কুমিল্লা সিভিল সার্জন ডা. নাছিমা আক্তার জানান, ‘জেলার সমন্বয়কদের মাধ্যমে যারাই আমাদের কাছে তথ্য পাঠাবেন, আমরা তাদের তথ্য দ্রুতই ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করব।’