• রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬, ১০:৪৮ পূর্বাহ্ন

স্ত্রীর কাছে স্বপ্নের দেশ লন্ডনে যাওয়া হলো না তুরাবের

সামিয়ান হাসান / ১৫৫ Time View
Update : সোমবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৪

সাংবাদিকতা ছেড়ে স্থায়ীভাবে স্বপ্নের দেশ লন্ডনে যাওয়ার ইচ্ছে থেকেই চলতি বছরের ১৩ই মে তানিয়া ইসলাম নামের এক যুক্তরাজ্য প্রবাসীকে বিয়ে করেন তুরাব। বিয়ের পর মাত্র ২ মাসের সংসার তারপর স্ত্রী তানিয়া চলে যান লন্ডনে। কথা ছিল যত দ্রুত সম্ভব স্বামী তুরাব কে নিজের কাছে নিয়ে যাবেন তানিয়া ইসলাম। দুজন মিলে নিজেদের মতো সংসার শুরু করবেন স্বপ্নের ঠিকানায়। স্বামীকে লন্ডন নিয়ে যাওয়ার তাড়নায় নিয়মিত কাজ করার পাশাপাশি ওভারটাইম কাজ শুরু করেন তানিয়া। টাকা জমানোর পাশাপাশি স্বামীকে নিজের কাছে নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত ডকুমেন্টস রেডি করছিলেন। সবকিছুই ঠিক ঠাক চলছিলো। কিন্তু হঠাৎ একটি ফোন কল যায় বাংলাদেশ থেকে। জানতে পারেন একটি বুলেট তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে তার জীবনসঙ্গীকে। সারা জীবনের মতো হারিয়ে ফেলেছেন স্বামী তুরাবকে। বৈষম বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংবাদ কাভার করতে গিয়ে ১৯ জুলাই সিলেট নগরীর প্রাণকেন্দ্র কোর্ট পয়েন্টে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক তুরাব। সেই সাথে পরিসমাপ্তি হয় তানিয়ার ৪ মাসের সংসারের। সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায় তানিয়ার। দেশে ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় তুরাবের মৃত মুখও দেখতে পারেননি প্রবাসে অবস্থানরত স্ত্রী তানিয়া ইসলাম।
ডাক নাম তুরাব হলেও কাগজে কলমে তার সঠিক নাম আবু তাহের তুরাব। বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার ফতেহপুর গ্রামে। পিতা মাস্টার আব্দুর রহিম পেশায় শিক্ষকতা করলেও সাংবাদিক হিসেবে ছিলেন বেশি পরিচিত। দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার বিয়ানীবাজার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি ছিলেন তিনি। মুলত বাবার অনুপ্রেরণাতেই সাংবাদিক পেশায় নিজেকে সম্পৃক্ত করে এটিএম তুরাব। দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার বিয়ানীবাজার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করলেও নিজের জীবনের স্বপ্নগুলোকে পরিপূর্ণ করতে অল্প সময়ের মধ্যে পাড়ি জমান সিলেট শহরে। সেখানে গিয়ে সিলেট থেকে প্রকাশিত দৈনিক জালালাবাদ পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। অদম্য ইচ্ছে আর পরিশ্রমের ফসল হিসেবে জাতীয় দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার সিলেট ব্যুরো প্রধান এর দায়িত্ব পেয়ে যায় তুরাব। সঠিক সংবাদ তুলে ধরতে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কাজ করে যান তুরাব।
পরিবারে তিন ভাই এর মধ্যে তুরাব ছিল সবার ছোট। অন্য দুই ভাই প্রবাসে থাকায় এবং নিজের কর্মস্থল শহরে হওয়ার কারণে সিলেট শহরে বাড়া বাসায় মা মমতাজ বেগম কে নিয়ে থাকতেন তিনি।
জানা যায়, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমর্থনে গত ১৯ জুলাই সিলেট মিছিলে সংঘর্ষ চলাকালে প্রাণ হারান এটিএম তুরাব।
পরিবারের অভিযোগ, সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন তুরাব।
তুরাবের বড় ভাই আবুল আহসান জানান, তুরাবের মৃত্যুর খবর শুনে পরদিনই তানিয়া দেশে আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ফ্লাইটের টিকিট না পাওয়ায় আসতে পারেননি। এমনকি ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় শেষবারের মতো স্বামীর মুখও দেখতে পারেননি তিনি। পরবর্তীতে আর কারো অপেক্ষা না করে হাসপাতাল থেকে তুরাব এর লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার ফতেহপুর গ্রামে বাড়িতে ২০ জুলাই তার দাফন সম্পন্ন হয়।
অল্প বয়সে ছেলেকে এভাবে হারিয়ে এখনও স্বাভাবিক হতে পারেননি তুরাবের মা মমতাজ বেগম।
প্রতিবেদকের সাথে দেখা হলে তিনি বার বার কান্না করছিলেন আর বলছেন ওরা আমার ছেলে কে মেরে ফেলেছে। আমি তাদের বিচার চাই।
বাসায় কেউ যাওয়ার পরেই তিনি প্রশ্ন করছেন, ‘পুলিশ কেন আমার ছেলেকে মারল?’
জানা যায়, কোটা সংস্কার আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে গত ১৯ জুলাই দুপুরে নগরের বন্দরবাজার এলাকা থেকে মিছিল বের করে বিএনপি এবং তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন। আচমকাই সেখানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বেধে যায় মিছিলকারীদের। পুলিশ মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলি ছোড়ে। ওই দিন আরও কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে সেখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন তুরাব। আচমকা সংঘর্ষ শুরু হলে তৎক্ষণাৎ নিজেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে পারেননি তিনি। সংঘর্ষ শুরুর কিছুক্ষণ পর সেখানে উপস্থিত সহকর্মীরা দেখেন তুরাব মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। তৎক্ষণাৎ তাকে সিলেটের ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান সহকর্মীরা। পরে সেখান থেকে তাকে নগরের সোবহানীঘাট এলাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে নেয়া হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় ইবনে সিনা হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থান তুরাবের মৃত্যু হয়। পরের দিন ২০ জুলাই ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তুরাবের মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়।
ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান শামসুল ইসলাম জানান, নিহতের শরীরে ৯৮টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। গুলিতে তার লিভার ও ফুসফুস আঘাতপ্রাপ্ত হয়। মাথায় ঢিলের আঘাতও ছিল। এ কারণেই তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
এদিকে তুরাব নিহত হওয়ার ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় একটি অভিযোগ করেন তার ভাই আবুল আহসান মো. আজরফ। এ অভিযোগে তুরাবের মৃত্যুর জন্য পুলিশকে দায়ী করা হয়। অজ্ঞাতনামা আট থেকে ১০ জন পুলিশ সদস্যকে অভিযুক্ত করে তুরাবের ভাই অভিযোগ দিলে পুলিশ সেটি গ্রহণ করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নথিভুক্ত করেছে, তবে অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি।

যা ছিল লিখিত অভিযোগে

কোতোয়ালি থানায় করা লিখিত অভিযোগ থেকে জানা যায়, ১৯ জুলাই বেলা একটা ৫৫ মিনিটে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য সিলেট নগরের বন্দরবাজার এলাকার কোর্ট পয়েন্টে অবস্থান করছিলেন সাংবাদিক এ টি এম তুরাব। একপর্যায়ে বিএনপি মিছিল শুরু করলে তুরাব মিছিলের পেছনে অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে অবস্থান নেন। মিছিলটি নগরের পুরান লেন গলির মুখে পৌঁছালে সশস্ত্র পুলিশ বিপরীত দিকে অবস্থান নেয়। ওই সময় হঠাৎ লাগাতার গুলিবর্ষণের শব্দ শোনা যায়। এর একপর্যায়ে তুরাব গুলিবিদ্ধ হয়ে চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তখন অন্য সহকর্মী ও পথচারীরা তাকে সিলেটের এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালটিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় এবং তুরাবের শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে নগরের সোবহানীঘাট এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্ধ্যা ছয়টা ৪৪ মিনিটে তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় পুলিশ বলছে, বন্দরবাজার এলাকায় সংঘর্ষে পুলিশের ওপর হামলা ও তুরাব নিহতের ঘটনায় ২০ জুলাই সিলেটের কোতোয়ালি থানায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছে। মামলায় এরই মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category