চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেল এখন শুধু প্রযুক্তির বিস্ময় নয় বরং আর্থিক সঙ্কট এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের একটি উদাহরণ। এই প্রকল্পের আওতায় টানেলের আনোয়ারা প্রান্তে নির্মাণ করা হয় দেশের একমাত্র ‘সাত তারকা’ মানের অতিথিশালা। প্রায় ৪৫০ কোটি টাকায় নির্মিত অতিথিশালাটি এক বছরের বেশি সময় ধরে অলস পড়ে আছে। সিদ্ধান্তহীনতায় সৃষ্ট জটিলতার কারণে যেটি এখন পরিত্যক্ত হওয়ার পথে। তবে সেতু বিভাগ বলছে, টানেলের এই অতিথিশালা লাভজনক করতে ইজারা দেবে।
টানেলের ব্যয় বাড়িয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের কথা মাথায় রেখে এই অতিথিশালা তৈরি করে সেতু বিভাগ। তিনি গেলে সেখানে থাকবেন, এমন চিন্তা ছিল প্রকল্পের কর্মকর্তাদের। কমিশন বাণিজ্যের জন্য অযৌক্তিক এ স্থাপনা নির্মাণে অনুমোদন দিয়েছিলেন তখনকার সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এই অতিথিশালা নির্মাণের মতো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
টানেল নির্মাণ প্রকল্পে যে জায়গায় অতিথিশালা নির্মাণ করা হয়েছে সেটাকে বলা হয় ‘সার্ভিস এরিয়া’। প্রকল্পের শুরুতে সার্ভিস এরিয়া ছিল না। মাঝপথে তা যুক্ত করে প্রায় ৭২ একর জায়গাজুড়ে তৈরি করা হয়েছে নানা স্থাপনা। পারকি সৈকত সংলগ্ন সমুদ্র ঘেঁষে গড়ে তোলা হয়েছে এই অভিজাত অতিথিশালা। এতে রয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার বর্গফুট আয়তনের ছয় কক্ষবিশিষ্ট আধুনিক সুসজ্জিত একটি বাংলো। আছে ৩০টি রেস্টহাউস ও বিশ্রামাগার।
এছাড়া রয়েছে টানেলের রেপ্লিকা, সম্মেলন কেন্দ্র, স্বাস্থ্য কেন্দ্র, হেলিপ্যাড, মসজিদ, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। আছে টেনিস মাঠ ও সুইমিংপুল। মাঝখানে নান্দনিক দুটি সেতু। আরও রয়েছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্য ও বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে একটি জাদুঘর। এসব স্থাপনায় বসানো হয়েছে ১ হাজার ১৮২ টন ক্ষমতার শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা। এসব স্থাপনা পাহারায় রয়েছে ৮০ জন ব্যাটালিয়ন আনসার।
পর্যটন করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, পারকি সৈকত এলাকায় ১৩ দশমিক ৩৩ একর জায়গায় ৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে অত্যাধুনিক পর্যটন কমপ্লেক্স নির্মাণ করছে পর্যটন করপোরেশন। এটি টানেলের অতিথিশালা থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে পর্যটন কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা। যদিও এখন পর্যন্ত কাজ হয়েছে ৮০ শতাংশ। এই প্রকল্পের অধীনে গড়ে তোলা হচ্ছে ১০টি একক বা সিঙ্গেল কটেজ, চারটি ডুপ্লেক্স কটেজ এবং তিনতলার একটি মাল্টিপারপাস ভবন। পর্যটন কমপ্লেক্সে হ্রদ ও শিশুদের খেলাধুলার জায়গাসহ নানা স্থাপনা থাকবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, টানেল প্রকল্পে অতিথিশালা নির্মাণের কোনো প্রয়োজনই ছিল না। পর্যটন করপোরেশনের পর্যটন কমপ্লেক্সই অতিগুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের জন্য যথেষ্ট ছিল।
এই অতিথিশালা নির্মাণে নষ্ট হয়েছে ফসলের খেত, লবণের মাঠ ও মাছের ঘের। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পারকি খালও। সরকারের বিপুল অপচয়ে ক্ষোভ জানিয়ে স্থানীয়রা বলছেন, সাত তারকা মানের হোটেলের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে টানেলের এই অতিথিশালা। তবে আধুনিক ব্যবস্থার সব বন্দোবস্ত থাকলেও অলস পড়ে আছে এসব বাংলো। অথচ এই অতিথিশালা নির্মাণে ফসলের খেত, লবণের মাঠ আর মাছের ঘের সবই নষ্ট হয়েছে। যারা এখানে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করত, তাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, চট্টগ্রাম নগরীর খুব কাছাকাছি এই অতিথিশালা ঠিক কতটা ভায়েবল হবে আমি বুঝতে পারছি না। এখানে মাত্র কয়েকটি পরিবার থাকতে পারবে। সেখান থেকে কত টাকা তুলতে পারবে, সেটা জানি না।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, টানেল প্রকল্পের এমন আর্থিক সঙ্কট এবং পরিকল্পনার ত্রুটিগুলো সরকার এবং জনগণের জন্য বড় শিক্ষা। অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের আগের যৌক্তিকতা ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প শুধু আর্থিক ক্ষতির উদাহরণ নয়, বরং অব্যবস্থাপনার একটি প্রতিচ্ছবিও। এখন সরকারের উচিত ভবিষ্যতের জন্য আরও সুপরিকল্পিত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া।
কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ বলেন,‘লোকসান কমিয়ে আয় বাড়াতে টানেলের সার্ভিস এরিয়া বেসরকারি খাতে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব বাংলো পর্যটন ব্যবসায় যুক্ত করতে দ্রুত দরপত্র আহবান করা হবে।’