ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মতিগঞ্জ ইউনিয়নের ছাড়াইতকান্দি গ্রামের প্রয়াত মাস্টার আহসান উল্যাহ ও নুর নাহারের ছেলে আবদুল গণি বোরহান (৩২)। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বিয়ে করেন একই উপজেলার চরছান্দিয়া ভূঞা বাজারসংলগ্ন এলাকায় সেলিম ভূঞা-বিবি হাজেরার মেয়ে আয়েশা আক্তারকে। অথচ বছর না পেরোতেই স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ হয়ে গেছে আয়েশার। জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার সঙ্গে অংশ নেওয়ার পর ৪ আগস্ট বিকেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন বোরহান।
পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় বোরহান কুমিল্লা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কামিল পাস করে রাজধানীতে সন্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্স চাকরি করতেন। আর আয়েশা সোনাগাজী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার ফাজিল (ডিগ্রি) প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। কথা ছিল ২০২৫ সালে আয়েশাকে ঢাকায় নিজের কাছে নিয়ে রাখবেন, কিন্তু কথা রাখতে পারেননি বোরহান।
আয়েশা জানান, রাজধানীর বাংলামোটর এলাকায় মিছিলে ছিলেন বোরহান। তখন একের পর এক গুলিতে তিনি রাজপথে লুটিয়ে পড়েন। ছাত্র-জনতা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তার মোবাইল ফোন থেকে কল পেয়ে বড় ভাই মহসিন ছুটে যান হাসপাতালে।
কাঁদতে কাঁদতে আয়েশা বলেন, ‘বছর না পেরোতেই আমার সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল। বোরহানের মা-বাবাও নেই। বোরহানের নিথর দেহ ৫ আগস্ট রাতে নিয়ে আসা হয় গ্রামের বাড়িতে। এখানে রাত ৯টায় তার লাশ দাফন করা হয় পারিবারিক কবরস্থানে। যখন আশপাশে চলছিল বিজয় উল্লাস, তখন বোরহানের বাড়িতে ছিল শোকের মাতম। আমার দুই চোখে এখন কেবলই অন্ধকার। ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছি।’
ইতোমধ্যে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে শহিদ বোরহানের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। জুলাই ফাউন্ডেশন থেকেও পেয়েছেন অনুদানের টাকা। তবে আয়েশার মতে, শুধু অনুদান নয়, বোরহানসহ সব শহিদের স্মৃতিকে অমলিন রাখতে সরকারের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বোরহানের বড় ভাই আমানত উল্যাহ বলেন, ‘ঘটনার এক সপ্তাহ আগে আমার ভাই বাড়ি থেকে ঢাকায় ফিরে যায়। কিন্তু সপ্তাহ ঘুরতেই ফিরে আসে কফিনবন্দি হয়ে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে শহিদ হয়ে সে শুধু পরিবার নয়, দেশবাসীকেও সম্মানিত করেছে। তাই শহিদদের প্রতি এ ঋণ শোধে দেশবাসীরও দায়িত্ব রয়েছে।’
আমানত উল্যাহ জানান, ৫ আগস্ট রাতে সোনাগাজী ছাবের পাইলট সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে জানাজার সময় স্থানীয়রা দাবি জানিয়েছিলেন ওই বিদ্যালয়ের নতুন ভবনকে বোরহানের নামে নামকরণের জন্য। এ ছাড়া সোনাগাজী পৌর শহরের জিরো পয়েন্টকে ‘বোরহান চত্বর’ নামকরণেরও দাবি তোলা হয়। বোরহানের হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে দেরি হওয়ায় মামলা করতেও বিলম্ব হচ্ছে। তবে খুব শিগগির তিনি অথবা তার ভাই মহসিন বাদী হয়ে মামলা করবেন। তিনি বোরহানসহ সব শহিদের হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন। এ ছাড়া শহিদ বোরহানের স্ত্রী আয়েশা আক্তারের কর্মসংস্থানে সরকারি উদ্যোগেরও দাবি জানান তিনি।