‘ডিমের ডজন ১৮০ টাকা। কম দাম হবে না। কারণ আড়তেই বেশি দাম।’ রাজধানীর তেজগাঁও স্টেশন রোডের জলিল ভ্যারাইটি স্টোরের স্বত্বাধিকারী আব্দুল কুদ্দুস খুচরা বিক্রির সময় এভাবেই ক্রেতাকে বেশ ঝাঁজের সঙ্গে ডিমের বাড়তি দামের কথা জানান। এ সময় সেখানে উপস্থিত ক্রেতারা ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ওপর থেকেই দাম বাড়ছে। সরকার দাম বেঁধে দেওয়ার পরও প্রতিদিন বাড়ছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
তেজগাঁওয়ে ‘বিক্রমপুর ডিমের আড়ত’-এর পাশেই এই দামে বিক্রি হচ্ছিল ডিম। আড়তদার জুবায়েরের অভিযোগ, বেশি দামে কেনা। তাই প্রতিটি ডিম ১৩ টাকা ১০ পয়সা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। সে হিসাবে এই আড়তে এক ডজন ডিমের দাম ১৫৭ টাকা ২০ পয়সা। অন্যদিকে কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতা রাফসান জাহান বলেন, আড়ত থেকে প্রতি পিস কিনতে হয়েছে ১৩ টাকা ৬০ পয়সা দরে।
খামারিরা বলছেন, নিয়মের তোয়াক্কা না করে ডিম উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করপোরেট সিন্ডিকেট প্রতিদিন সরকার-নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে ডিম বিক্রি করছে। সরকারের নির্ধারিত দামে খুচরা পর্যায়ে ডিমের দাম হওয়ার কথা ১৪৪ টাকা ডজন। তবে আড়তেই করপোরেট সিন্ডিকেট বেশি দামে ডিম বিক্রি করায় খুচরায় ডিমের দাম পড়ছে প্রায় ১৮০ টাকা ডজন। এভাবে বেশি দামে বিক্রি করে গত ২০ দিনে ভোক্তাদের পকেট থেকে ১৬০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি চক্র। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে মামলা হওয়ার পরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় ভোক্তাদের পকেট কাটা থামছে না। এখনই কঠোরভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে বাজার আরও অস্থির হবে। ডিম ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করপোরেট ব্যবসায়ী, আড়তদার, খামারি, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এক বছর ধরে ডিমের দাম বাড়ছে। বাধ্য হয়ে সরকার দাম বেঁধে দেয়। গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মোহাম্মদ রেয়াজুল হকের সই করা চিঠিতে সংশ্লিষ্টদের ডিমের দাম ডজনে ১৪৪ টাকা বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়। চিঠিতে জানানো হয়, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং পোলট্রিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের নেতাদের সমন্বয়ে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের মতামতের ভিত্তিতে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ২০২৪ সালের মুরগি (সোনালি ও ব্রয়লার) ও ডিমের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের ডিম বিক্রেতা কামাল হোসেন বলেন, ‘ডিমের ডজন ১৭০ টাকা।’ এই বাজারের অন্য ডিম ব্যবসায়ীরাও বলেন, ‘প্রতিদিন বাড়ছে ডিমের দাম। আড়তেই বাড়ছে। সে ক্ষেত্রে আমরা কী করব।’
ডিমের দাম প্রসঙ্গে কারওয়ান বাজারের বিক্রেতা রাফসান জাহান ক্যাশ মেমো দেখিয়ে বলেন, শনিবার ১৩ টাকা ২০ পয়সা পিস কেনা হয়েছে। গতকাল তা ১৩ টাকা ৬০ পয়সা কিনতে হয়েছে। তাই বেশি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। এক ডজনে ৬ টাকা লাভ হয়। হাতিরপুল বাজারের খুচরা বিক্রেতাদেরও একই অভিযোগ, আড়ত থেকেই কিনতে হচ্ছে বেশি দামে।
কারওয়ান বাজারের ডিম বিক্রেতা রাফসানের দোকানে ডিম কেনার সময় নাঈম উদ্দীনসহ আরও দুজন ছাত্র বলেন, ‘লেখাপড়া শেষ করে চাকরি পাওয়ার আশায় ঢাকায় অবস্থান করছি। সব জিনিসের দাম বাড়তি। কম দামের আমিষ ডিমের দামও হুহু করে বাড়ছে।’
খুচরা বিক্রেতাদের কথার সত্যতা যাচাই করতে গতকাল বিকেলে তেজগাঁও স্টেশন বাজার রোডে সরেজমিন গেলে দেখা যায়, অধিকাংশ আড়তের দোকানগুলোতে তালা মারা। গভীর রাত থেকে ভোরের মধ্যেই তারা বেচাকেনা শেষ করেন।
তেজগাঁও ডিম আড়ত ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি আমান উল্লাহ বলেন, ‘আড়তে প্রতি পিস ১৩ টাকা ১০ পয়সা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। এর চেয়ে কমে বিক্রি করলে লোকসান করতে হবে। পিসে ১০ পয়সা লাভ করা হয়। দোকান ভাড়া, পরিবহন খরচও তো আছে। সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে আমরা কিনতেই পারি না। তাহলে বিক্রি করব কীভাবে? গতকাল প্যারাগন, ডায়মন্ডসহ বিভিন্ন কোম্পানি ১১ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১২ টাকা পিস বিক্রি করেছে। তার পরও তাদের সেই ডিম আমরা পাই না।’
কী করলে ডিমের দাম কমবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে এই ডিম ব্যবসায়ী দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, ‘পাইকারি পর্যায়ে ১১ টাকা পিস বিক্রি করতে হবে। কার সঙ্গে কথা বলে সরকার এ দাম নির্ধারণ করেছে, তা আমরা জানি না। করপোরেটদের কথা শুনলে হবে না। ডিম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ডায়মন্ডই তো ১২ টাকা পিস বিক্রি করছে। খামারে বেশি লাভ করা হয় না। তারা লোকসান দিয়ে ব্যবসা করছে। অনেক খামার বন্ধ হয়ে গেছে। অবশ্যই বাচ্চা ও খাদ্যের দাম কমাতে হবে।’
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে খামারিদের উৎপাদিত ডিম ৮০ শতাংশ চাহিদা মেটায়। তার পরও করপোরেটরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এ ব্যাপারে প্রান্তিক খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, ‘বাজারকে অস্থির করার জন্যই প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ডিম ও মুরগির দাম নির্ধারণ করেছে। দাম নির্ধারণের সময় তারা আমাদের কোনো প্রতিনিধি রাখেনি। করপোরেটদের কথামতো এই দাম বেঁধে দিয়েছে। ফলে বাজারে কোনো প্রভাব নেই। বরং বেশি দামেই বিক্রি হচ্ছে। আমাদের খামারে ডিমের উৎপাদন খরচই ১০ টাকা ২৯ পয়সা। তাহলে কীভাবে ১০ টাকা ৫৮ পয়সা পিস বিক্রি করা যায়। কিন্তু করপোরেটদের উৎপাদন খরচ ৮ টাকা ৪০ পয়সা। তারা ১১ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১২ টাকা পিস বিক্রি করছে। তারা ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে বা কমিয়ে খামারিদের নিঃস্ব করে দিচ্ছে। আবার আমাদের কাছে বেশি দামে খাদ্য ও মুরগির বাচ্চা বিক্রি করছে। অবশ্যই সরকারকে এই খাদ্য ও বাচ্চার দাম কমাতে হবে। না হলে বাজার আরও অস্থির হয়ে যাবে।’
অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, করপোরেট ব্যবসায়ীরা দেশের সব জায়গায় মোবাইলে মেসেজ দিয়ে দাম বেঁধে দেন। দাম কমলে ব্যবসায়ীরা ডিম হিমাগারে রাখছেন। দাম বাড়লে বিক্রি করছেন। সরকার নির্দেশ দিলে ১০ টাকা ৫৮ পয়সা দরে ডিম বিক্রি করতে তারা বাধ্য হবেন। কিন্তু করপোরেটরা উৎপাদক পর্যায়ে ১১ টাকা দরে বিক্রি করার কথা বললেও বাস্তবে ১১ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৫০ পয়সা দরে প্রতি পিস বিক্রি করছে। প্রতিদিন তারা ৪ কোটি ডিম বিক্রি করছে। এভাবে বেশি দামে বিক্রি করার মাধ্যমে তারা ২০ দিনে ১৬০ কোটি টাকা ভোক্তাদের পকেট থেকে হাতিয়ে নিয়েছে।’
এই সিন্ডিকেট গত বছরও এই সময়ে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রতিযোগিতা কমিশন তাদের বিরুদ্ধে গত বছরও মামলা করেছে। কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তি হয়নি।
ডিমের বাড়তি দাম আদায় করার ব্যাপারে ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা বাজারে চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ ডিম সরবরাহ করি। এটা দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না।’
এর আগে বেশি দাম রাখায় আপনাদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি, তাই সুযোগে ভোক্তাদের পকেট কাটছেন কি না- এমন অভিযোগের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এই অভিযোগ সঠিক নয়। আসলে এই সময়ে ডিমের চাহিদা বেড়ে গেছে। কিন্তু এবার গরমে অনেক এলাকার খামার নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে উৎপাদন কমে গেছে। আবার দেশি ভুট্টা, সয়াবিনসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। ডলারের দাম তো কমে না। তাই এ মুহূর্তে খাবারের দাম কমানো সম্ভব না।’