দ্রুতই কমে আসছিল রেললাইনে দাঁড়ানো নারী ও চলন্ত ট্রেনের মধ্যকার দূরত্ব। আতঙ্কে চিৎকার করে তাঁকে সেখান থেকে সরে দাঁড়াতে বলছিলেন আশপাশের লোকজন। তবে এতেও কাজ হচ্ছিল না। ট্রেনে প্রায় কাটা পড়তে যাচ্ছিলেন ৩০ বছর বয়সী ওই নারী। পরে রেললাইন থেকে ওই নারীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন এক বৃদ্ধ। এতে উভয়ই প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে নরসিংদী রেলওয়ে স্টেশনসংলগ্ন বটতলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের ধারণা, ওই নারী আত্মহত্যার জন্যই রেললাইনে অবস্থান নিয়েছিলেন। সাহসিকতা দিয়ে তাঁকে বাঁচিয়ে এখন প্রশংসায় ভাসছেন ওই বৃদ্ধ।
বেঁচে যাওয়া ওই নারী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানা এলাকার বাসিন্দা। অন্যদিকে ওই বৃদ্ধের নাম কুদ্দুস মিয়া (৬৫)। তাঁর বাড়ি কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম থানায়। কুদ্দুস নরসিংদী শহরের শাপলা চত্বরে মাছের ব্যবসা করেন।
রেলওয়ে পুলিশ, স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে চট্টগ্রামগামী চট্টলা এক্সপ্রেসে করে বাড়ি ফিরছিলেন ওই নারী। বিকেল চারটার দিকে ট্রেনটি নরসিংদী স্টেশনে থামলে তিনি নেমে যান। পরে দুটি ব্যাগ একটি দোকানে রেখে রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে মুঠোফোনে কথা বলতে থাকেন।
এ সময় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা একটি দ্রুতগতির ট্রেন স্টেশন অতিক্রম করছিল। আশপাশের লোকজন নিরাপদে সরে গেলেও ওই নারী রেললাইন ছেড়ে যাচ্ছিলেন না। উপস্থিত লোকজন চিৎকার করে সতর্ক করছিলেন, ট্রেনও হুইসেল দিচ্ছিল। পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠলে কুদ্দুস মিয়া প্রায় ২০ গজ দৌড়ে গিয়ে ওই নারীকে ধাক্কা দিয়ে রেললাইন থেকে সরিয়ে দেন। মুহূর্তেই ট্রেনটি তাঁদের পাশ দিয়ে চলে যায়।
ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দারা ওই নারীকে ঘিরে ধরেন। তাঁর কথাবার্তা অসংলগ্ন মনে হওয়ায় রেলওয়ে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে নরসিংদী রেলওয়ে ফাঁড়িতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হয়। স্বজনেরা ফাঁড়িতে পৌঁছালে তাঁকে তাঁদের জিম্মায় দেওয়া হয়। পুলিশ পরিবারের সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছে।
ওই নারীর বোন মুঠোফোনে জানান, প্রাণে রক্ষা পাওয়া ওই নারী দীর্ঘদিন মরিশাসের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেছেন। সম্প্রতি দেশে ফেরার পর তাঁর স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এর পর থেকেই তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কম কথা বলতেন। ঘটনার দিন তিনি ঢাকায় বোনের বাসা থেকে কসবায় ফিরছিলেন।
নিজের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে কুদ্দুস মিয়া বলেন, ‘মেয়েটি মোবাইলে কথা বলছিল। ট্রেন আসতাছে, সেদিকে খবর নাই। মাত্র এক-দুই সেকেন্ড হেরফের হলেই মেয়েটি ট্রেনে কাটা পড়তো। কপাল ভালো, দৌড় দিসিলাম। আর এক সেকেন্ড পর হলেই দুজনেই ডাইরেক্ট ট্রেনের তলে কাটা পড়তাম।’
নরসিংদী রেলওয়ে ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) দিলীপ চন্দ্র সরকার বলেন, ওই নারী তাঁকে জানিয়েছেন, মন খারাপ থাকায় তিনি নরসিংদী স্টেশনে নেমে পড়েছিলেন। তাঁর আচরণে আত্মহত্যার প্রবণতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এ কারণে পরিবারকে দ্রুত কাউন্সেলিং ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।